দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু নিখোঁজ, নিখোঁজের পর মরদেহ উদ্ধার এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। কোনো শিশু পথ হারিয়ে নিখোঁজ হচ্ছে, কেউ পারিবারিক বিরোধ বা অন্য কোনো কারণে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে; আবার কিছু ঘটনায় নিখোঁজের পর শিশুর মরদেহ উদ্ধারের খবরও সামনে আসছে। প্রতিটি ঘটনার কারণ এক নয়। তবে এসব ঘটনা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে পরিবার ও সমাজকে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন থানায় ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশু উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরে গেছে। তবে ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান তখনও পাওয়া যায়নি। নিখোঁজের এই পরিসংখ্যান শিশুদের নিরাপত্তা ও তাদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ নিয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
বয়সভেদেও নিখোঁজের ঘটনায় পার্থক্য রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে শূন্য থেকে ৯ বছর বয়সী ৪৭৪ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪০৬ জনকে উদ্ধার করা হলেও ৬৮ জনের সন্ধান মেলেনি। অন্যদিকে ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১৫ হাজার ২৪৩ শিশুর নিখোঁজের জিডি হয়েছে; তাদের মধ্যে ১৩ হাজার ২৭৩ জন উদ্ধার হলেও ১ হাজার ৯৭০ জনের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ হওয়ার কারণও সব শিশুর ক্ষেত্রে এক নয়। ছোট শিশুরা অনেক সময় পথ হারানো কিংবা অভিভাবকের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে নিখোঁজ হতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে পারিবারিক বিরোধ, অভিমান, বন্ধুদের প্রভাবসহ বিভিন্ন বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কোনো শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে একক কোনো কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা না করে প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি।

উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো—নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ঘটনায় ২৫৪ শিশুর মৃত্যুর তথ্য সংগঠনটির পর্যবেক্ষণে এসেছে। আসকের তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সংগঠনটির নিজস্ব পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে সংগৃহীত।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন—পুলিশ সদর দপ্তরের নিখোঁজের পরিসংখ্যান এবং আসকের মৃত্যুর তথ্য একই ধরনের তথ্য নয়। পুলিশের হিসাব নিখোঁজের ঘটনায় করা জিডি ও উদ্ধার পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে। অন্যদিকে আসকের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণনির্ভর। তাই দুটি তথ্যকে একই সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে শিশু নিরাপত্তার বিষয়ে দুটি পৃথক তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
সন্তানের নিরাপত্তায় অভিভাবকদের ভূমিকা
শিশুর নিরাপত্তার প্রথম ধাপ শুরু হয় পরিবার থেকেই। ছোট বয়স থেকেই শিশুকে নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, বাড়ির ঠিকানা এবং অন্তত একজন অভিভাবকের মোবাইল নম্বর মনে রাখতে শেখানো দরকার। অপরিচিত কেউ খাবার, উপহার বা কোথাও নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দিলে কীভাবে নিরাপদে বিষয়টি এড়িয়ে যাবে, সেটিও শিশুকে সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে।
শিশু স্কুল, কোচিং, খেলাধুলা কিংবা অন্য কোথাও গেলে কখন বের হয়েছে, কার সঙ্গে গেছে এবং কখন ফেরার কথা—এসব বিষয়ে অভিভাবকের ধারণা থাকা প্রয়োজন। ছোট শিশুর ক্ষেত্রে একা চলাফেরা না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা এবং পরিচিত ও নিরাপদ ব্যক্তির সঙ্গে যাতায়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে অভিভাবকের দায়িত্ব মানেই সারাক্ষণ কঠোর নজরদারি নয়। শিশুর সঙ্গে বিশ্বাস ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করাও নিরাপত্তার অংশ। শিশু যেন ভয় বা শাস্তির আশঙ্কা ছাড়াই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা, অপরিচিত ব্যক্তির আচরণ কিংবা নিজের সমস্যার কথা বাবা-মাকে বলতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
অনলাইনেও সতর্কতা জরুরি
শিশুদের নিরাপত্তার একটি বড় অংশ এখন অনলাইন জগতের সঙ্গে যুক্ত। অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য দেওয়া, নিজের অবস্থান প্রকাশ করা কিংবা অনলাইনে পরিচিত কারও সঙ্গে অভিভাবকের অজান্তে দেখা করতে যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে শিশুকে সচেতন করতে হবে।
অভিভাবকদেরও সন্তানের অনলাইন ব্যবহারের বিষয়ে দায়িত্বশীলভাবে খোঁজ রাখা প্রয়োজন। তবে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের বদলে শিশুর সঙ্গে আলোচনা করে নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়ম তৈরি করা বেশি কার্যকর হতে পারে।
শিশু নিখোঁজ হলে দেরি নয়
কোনো শিশু নির্ধারিত সময়ে বাড়ি না ফিরলে বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। প্রথমে তার বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষক, আত্মীয় ও পরিচিতদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করতে হবে। প্রয়োজন হলে দ্রুত থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে হবে। শিশুর সাম্প্রতিক ছবি, পরনের পোশাক, কোথায় এবং কখন শেষবার দেখা গেছে—এসব তথ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিতে হবে।
নিখোঁজ শিশুর বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে হবে। যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে দিলে অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তাই দায়িত্বশীলভাবে তথ্য প্রকাশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করা জরুরি।
দায় শুধু অভিভাবকের নয়
শিশু নিখোঁজ বা মৃত্যুর ঘটনায় অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি থাকতে পারে কি না, তা কোনো কোনো ঘটনায় তদন্তের বিষয় হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারকে দায়ী করা ঠিক নয়। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সবার যৌথ দায়িত্ব।
একটি শিশু নিরাপদে স্কুলে যাবে, খেলবে, বাড়ি ফিরবে—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। সেই স্বাভাবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবারকে যেমন সতর্ক হতে হবে, তেমনি শিশুদের জন্য নিরাপদ সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ তৈরিতেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
আজ যে শিশুটি নিখোঁজ হয়েছে, সে কারও সন্তান। তার পরিবার যে উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে, তা যেন অন্য কোনো পরিবারকে বহন করতে না হয়। তাই আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, দায়িত্বশীল নজরদারি, দ্রুত পদক্ষেপ এবং সামাজিক সহযোগিতা।
সন্তানের নিরাপত্তায় অভিভাবকের সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ প্রথম প্রতিরোধ। কিন্তু শিশুকে নিরাপদ রাখার দায়িত্ব শুধু পরিবারের নয়—এটি আমাদের সবার। একটি সতর্ক পরিবার, দায়িত্বশীল সমাজ এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা—এই তিনের সমন্বয়েই শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
তথ্যসূত্র: পুলিশ সদর দপ্তর ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
লেখক
দূর্গেশ সরকার বাপ্পী
সংবাদকর্মী





