মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার লংলা চা-বাগান। চারপাশে সবুজের বিস্তার, পাহাড়ের ঢালে চা-গাছের সারি আর শ্রমজীবী মানুষের প্রতিদিনের ব্যস্ততা। এই চা-বাগানেই বেড়ে ওঠা চম্পা নাইডু এখন ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের পিএইচডি গবেষক। চা-শ্রমিক পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; নিজের শেকড়ের মানুষের জীবন ও অধিকার নিয়ে কাজ করার এক দীর্ঘ প্রত্যয়ের গল্পও।
২০১০ সালে চা-শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে ভর্তি হন চম্পা। সেখানে বিনা খরচে পড়াশোনা ও আবাসনের সুযোগ পান তিনি। লংলা চা-বাগানের পরিবেশে বেড়ে ওঠা সেই মেয়েটিই ২০১৫ সালে ক্যামেলিয়া ডানকান হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে কুলাউড়ার ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হয়ে ২০১৭ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। তাঁর ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ডাচ্-বাংলা ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তিও পান।
এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য চম্পার গন্তব্য হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও নিজের শেকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ ধরে রাখেন তিনি। চা-বাগানে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁকে কাছ থেকে দেখিয়েছে শ্রমিকদের জীবন, তাঁদের নানা সীমাবদ্ধতা ও অধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন। ফলে নিজের একাডেমিক আগ্রহও ধীরে ধীরে সেই বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। চা-শ্রমিকদের শিক্ষা, মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে কাজ করার আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর মধ্যে।
এই আগ্রহই পরে গবেষণার পথ তৈরি করে দেয়। ২০২৩ সালে ভারত সরকারের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (আইসিসিআর) বৃত্তি নিয়ে ভারতে যান চম্পা। ভর্তি হন অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্ধ্র প্রদেশকে বেছে নেওয়ার পেছনে তাঁর পারিবারিক শেকড়ও একটি কারণ। তাঁর পূর্বপুরুষদের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক রয়েছে এবং তেলুগু ঐতিহ্যের সঙ্গে রয়েছে তাঁর পারিবারিক যোগসূত্র।
পড়াশোনার পরবর্তী ধাপে আবারও আইসিসিআর বৃত্তি পান চম্পা। ২০২৫ সালে অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি গবেষণার সুযোগ পান তিনি। তাঁর গবেষণার সময়কাল ২০২৫ থেকে ২০২৮ সাল। গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের জীবন, মানবাধিকার এবং তাঁদের সামাজিক বাস্তবতা। জননীতি কীভাবে শ্রমিকদের জীবনমান ও অধিকার নিশ্চিত করতে পারে—গবেষণায় সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তিনি।
চম্পা মনে করেন, গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু সমস্যা চিহ্নিত করা নয়; সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের পথও খুঁজে বের করা জরুরি। তাঁর গবেষণার মূল ভাবনা ‘পাবলিক পলিসি ও হিউম্যান রাইটস’। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, সামাজিক মর্যাদা এবং অধিকার নিশ্চিত করতে নীতিগত পরিবর্তনের সুযোগগুলো নিয়ে তিনি কাজ করছেন।
লংলা চা-বাগানে চম্পার এই অর্জন এখন অন্য শিশু-কিশোরদের কাছেও অনুপ্রেরণার গল্প। চা-বাগানের ছোট্ট মেয়েরা তাঁকে দেখে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছে। তাঁদের কাছে চম্পা এখন এমন একজন মানুষ, যিনি একই শেকড় থেকে উঠে এসে দেশের সীমানা পেরিয়ে গবেষণার জগতে জায়গা করে নিয়েছেন।
চম্পার পথচলা তাই শুধু একটি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের গল্প নয়। যে চা-বাগান তাঁর শৈশবের ঠিকানা, সেই বাগানের মানুষের জীবনকেই তিনি গবেষণার বিষয় করেছেন। নিজের শেকড়কে পেছনে ফেলে নয়, বরং সঙ্গে নিয়েই তিনি এগিয়ে যাচ্ছেন উচ্চশিক্ষার আরও দূর পথের দিকে।





