ডাক্তার’—শব্দটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা অ্যাপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ আর মানুষের অসুস্থতার সময়ে আশ্রয়ের একটি মুখ। শরীর খারাপ হলে যে মানুষটির কাছে আমরা ছুটে যাই, সুস্থ হওয়ার আশায় যার ওপর আস্থা রাখি, তিনি একজন চিকিৎসক। কখনো অস্ত্রোপচারের টেবিলে নিজের জীবনও তাঁর হাতে তুলে দেন রোগী। তাই চিকিৎসক হওয়া শুধু একটি পেশায় প্রবেশের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম, মানসিক চাপ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ।

বাংলাদেশে একজন চিকিৎসক হওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় মেডিকেল কলেজে ভর্তির মধ্য দিয়ে। ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত আসন পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি মেডিকেলে ঢোকার পর শুরু হয় আরও দীর্ঘ ও কঠিন এক অধ্যায়। পাঁচ বছরের এমবিবিএস শিক্ষাজীবন এবং পরবর্তী এক বছরের ইন্টার্নশিপের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে তৈরি হন একজন চিকিৎসক।

কেমন সেই যাত্রা? কতটা কঠিন মেডিকেলের পড়াশোনা? পরীক্ষা, চাপ, ব্যক্তিগত জীবনের সীমাবদ্ধতা কিংবা ভবিষ্যৎ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা কীভাবে দেখেন শিক্ষার্থীরা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কথা বলা হয়েছে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে।

ভর্তির কয়েকগুণ পরিশ্রম এমবিবিএসে

মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হয়, ভর্তির পর তার চেয়েও বেশি পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় বলে মনে করেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী কে এম মাহির শাহরিয়ার।

তাঁর ভাষায়, মেডিকেল শিক্ষাজীবনে নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন পরীক্ষা নিয়ে সবসময়ই এক ধরনের মানসিক চাপ কাজ করে। একের পর এক আইটেম, কার্ড ও পেশাগত পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনও অনেকটা সংকুচিত হয়ে আসে।

তিনি বলেন, আত্মীয়স্বজনের সুখ-দুঃখে পাশে থাকতে না পারার কষ্ট থাকে। অসুস্থ হলেও পরদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হয়। যে বয়সে বন্ধুদের সঙ্গে ঘোরাঘুরি, অনুষ্ঠান কিংবা আনন্দে সময় কাটানোর কথা, সেই সময়ের বড় একটি অংশ চলে যায় বই, নোট ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।

তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে চাপের মুহূর্তগুলোর একটি হলো পেশাগত পরীক্ষার ভাইভা। একাধিক অধ্যাপক পরীক্ষার্থীর সামনে বসে প্রশ্ন করেন, আর সেই কয়েক মিনিটেই নিজের দীর্ঘ প্রস্তুতি তুলে ধরতে হয়। হাজারো প্রশ্ন ও সম্ভাব্য উত্তরের চিন্তা মাথায় নিয়েই ভাইভা কক্ষে প্রবেশ করতে হয় শিক্ষার্থীদের।

‘স্বপ্নের পথটা বাইরে থেকে যতটা সুন্দর, বাস্তবে ততটাই কঠিন’

শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী নাইম ফেরদৌস অর্পিতার কাছে চিকিৎসক হওয়ার পথটি একই সঙ্গে কঠিন ও শিক্ষণীয়।

ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার প্রতি আকর্ষণ ছিল তাঁর। এইচএসসি পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি শুরু করার সময় মনে হয়েছিল, কয়েক মাসের অনিশ্চয়তা পেরোলেই হয়তো স্বস্তি মিলবে। কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, স্বপ্ন পূরণের পথটি বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা অনেক বেশি পরিশ্রমসাধ্য ও দায়িত্বপূর্ণ।

বিশাল সিলেবাস, দীর্ঘ সময়ের পড়াশোনা এবং নিয়মিত পরীক্ষার সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লেগেছে তাঁর। সপ্তাহজুড়ে একের পর এক পরীক্ষা ও আইটেমের প্রস্তুতি শেষে ছুটির দিনেও পরবর্তী পরীক্ষার পড়া চালিয়ে যেতে হয়।

তাঁর উপলব্ধি, মেডিকেল শুধু ভালো শিক্ষার্থী হওয়ার শিক্ষা দেয় না; ধৈর্যশীল, দায়িত্ববান ও সহমর্মী মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে সাহায্য করে। একটি কঠিন বিষয় বুঝতে পারা, রোগীর সঙ্গে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলতে পারা কিংবা ব্যর্থতার পরও পরদিন নতুন করে শুরু করতে পারাও এখানে সাফল্যের অংশ।

পরীক্ষা যেন শেষই হয় না

গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী মুনতাসীর ইসলামের কাছে মেডিকেল শিক্ষার বড় বাস্তবতা হলো ধারাবাহিক পরীক্ষা।

তাঁর বর্ণনায়, মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার পর শুরু হয় আইটেম, টার্ম, কার্ড ও পেশাগত পরীক্ষার ধারাবাহিকতা। লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক—প্রতিটি অংশেই আলাদা প্রস্তুতি নিতে হয়। ব্যবহারিক পরীক্ষার ক্ষেত্রেও থাকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে দক্ষতা যাচাই।

মুনতাসীর বলেন, একটি পেশাগত পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে পরবর্তী ধাপে যেতে বিলম্ব হতে পারে। বিশেষ করে চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষা দীর্ঘ প্রস্তুতি ও মানসিক চাপের কারণে শিক্ষার্থীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি অংশে ব্যর্থতা পুরো প্রক্রিয়াকে পিছিয়ে দিতে পারে।

তাই পাঁচ বছরের এমবিবিএস কোর্স নির্ধারিত সময়ে শেষ করার পাশাপাশি পরীক্ষার ধারাবাহিকতা সামলানোও শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

‘একটু সময়ের যেন খুব অভাব’

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আয়েশা হক ঐশির অভিজ্ঞতায়, মেডিকেল জীবনের প্রথম বড় ধাক্কা আসে সময়ের সংকট থেকে।

স্কুল-কলেজে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে আড্ডা দেওয়ার অভিজ্ঞতা থাকলেও মেডিকেলে এসে চিত্রটা পুরোপুরি বদলে যায়। পড়ার জন্য হলের বারান্দা, করিডর কিংবা সিঁড়ির পাশের ফাঁকা জায়গাতেও শিক্ষার্থীদের বসে থাকতে দেখা যায়।

তাঁর ভাষায়, এখানে ক্লাসের চেয়ে পরীক্ষার উপস্থিতিই যেন বেশি মনে হয়। সিলেবাস শেষ হয় না, পরীক্ষার প্রস্তুতিও শেষ হয় না। অনেক সময় সারারাত পড়েও ভাইভায় কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তাই সময়ের সংকটের কথা বলতে হয়। ব্যক্তিগত জীবন, ঘুম ও অবসর—সবকিছুর সঙ্গে পড়াশোনার ভারসাম্য তৈরি করাই হয়ে ওঠে আরেকটি চ্যালেঞ্জ।

স্বপ্নের পরও শেষ নয় যুদ্ধ

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান তুষারের কাছে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা ছোটবেলা থেকেই। এইচএসসির পর কঠিন ভর্তি পরীক্ষায় সাফল্য পেয়ে মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ মেলে। কিন্তু ভর্তি হওয়ার পরই শুরু হয় নতুন বাস্তবতা।

মেডিকেলের শুরুতে স্বপ্নপূরণের আনন্দ থাকলেও কিছুদিন পর পড়ার চাপ ও পরীক্ষার ব্যস্ততা সেই জীবনের রং বদলে দেয়। আইটেম, কার্ড, টার্ম এবং পেশাগত পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে তবেই পরবর্তী বর্ষে যাওয়ার সুযোগ আসে।

এই ধারাবাহিকতায় ঘুম কমানো, ব্যক্তিগত সময় সংকুচিত করা, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা বন্ধুদের আড্ডা বাদ দেওয়ার মতো ত্যাগও করতে হয় অনেক শিক্ষার্থীকে।

তবে এমবিবিএস শেষ করেই চিকিৎসকের শেখার পথ শেষ হয় না। ইন্টার্নশিপের পর উচ্চতর শিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত জীবনের নানা ধাপ সামনে আসে। অর্থাৎ চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হলেও দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলতে থাকে দীর্ঘদিন।

সাদা অ্যাপ্রোনের আড়ালে দীর্ঘ প্রস্তুতি

সাদা অ্যাপ্রোন দেখে চিকিৎসকের পেশাকে যতটা সহজ মনে হয়, এর পেছনের প্রস্তুতি ততটাই দীর্ঘ। ভর্তি পরীক্ষার প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে বছরের পর বছর পড়াশোনা, নিয়মিত পরীক্ষা, ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন, রোগীর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ইন্টার্নশিপ—প্রতিটি ধাপেই শিক্ষার্থীদের দিতে হয় সময় ও শ্রম।

মেডিকেল শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতায় তাই চিকিৎসক হওয়ার গল্প শুধু সাফল্যের গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে স্বপ্ন, অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি, ত্যাগ, পরীক্ষা ও দায়িত্ববোধের গল্প।

শেষ পর্যন্ত একজন চিকিৎসকের হাতে যখন একজন রোগী নিজের জীবন ও সুস্থতার আশা তুলে দেন, তখন সেই আস্থার পেছনে থাকে দীর্ঘ কয়েক বছরের কঠিন প্রস্তুতি। সাদা অ্যাপ্রোনটি তাই শুধু একটি পোশাক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য রাত জাগা, পরীক্ষার চাপ, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং মানুষের সেবা করার দায়িত্ব।

লেখক ও অভিজ্ঞতা প্রদানকারীরা

মূল লেখক:

আরাফাত নাফিস

শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সাদা অ্যাপ্রোনের আড়ালে: ডাক্তার হওয়ার পথের গল্প জানালেন যারা :

কে এম মাহির শাহরিয়ার

ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ

নাইম ফেরদৌস অর্পিতা

শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ

মুনতাসীর ইসলাম

গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ

আয়েশা হক ঐশি

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ

সাইফুর রহমান তুষার

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ