রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে সরকারি ব্যবস্থাপনায় কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার বিতরণ নিয়ে উঠেছে নানা অভিযোগ। কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা সার জেলার বাইরে বিক্রি, সরকারি মূল্যের চেয়ে বাড়তি দাম আদায় এবং চাহিদা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের সার না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন ডিলারের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, ডিলারদের একাংশের অনিয়মের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের দুর্বল নজরদারির কারণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এতে আমন মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার না পেয়ে বিপাকে পড়ছেন কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, গোয়ালন্দ উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির পাঁচ ডিলারের মধ্যে কয়েকজন চাহিদা অনুযায়ী খুচরা বিক্রেতাদের সার সরবরাহ করেন না। কখনো ‘সার নেই’ বলে জানানো হয়, আবার কখনো বাড়তি টাকা ছাড়া সার দিতে অনীহার অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে জেলার বাইরে তুলনামূলক বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি দামের সঙ্গে বাজারদরের পার্থক্য তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও ৫০ কেজির এক বস্তা সারের জন্য ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে এমওপি সার নিয়ে বেশি ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন তারা।
চালান আটকে দেওয়ার ঘটনা
সম্প্রতি মেসার্স মন্ডল ট্রেডার্স থেকে ফরিদপুর সদর উপজেলার ঈশান গোপালপুর এলাকার কোব্বাত নামের এক খুচরা বিক্রেতার কাছে সার বিক্রির অভিযোগ ওঠে। এ সময় স্থানীয় কৃষকরা সার বহনকারী চালান আটকে দেন। পরে সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দেলোয়ার নামে এক ব্যক্তি সেখানে গিয়ে সার নিয়ে চলে যান। এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে বলেও দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এ বিষয়ে পরে মন্ডল ট্রেডার্সকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযোগের ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য সামনে আসার পরও বিষয়টি কি শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
আগেও জরিমানার অভিযোগ
গত ১৮ আগস্ট অবৈধভাবে সার পাচারের সময় এক ডিলারকে আটক করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে এর আগেও সার পাচারের অভিযোগে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছিল।
এ ছাড়া কয়েক দিন আগে মুন্সি বাজার এলাকায় অবৈধভাবে বিক্রির সময় সার জব্দ করা হয়। পরে ওই সার উপজেলা পর্যায়ে নেওয়া হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরবর্তীতে জব্দ করা সেই সার মন্ডল ট্রেডার্সের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
মন্ডল ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে এর আগে স্থানীয় কৃষকদের পক্ষ থেকে মানববন্ধনও করা হয়েছিল। অভিযোগের পর প্রায় দুই মাস প্রতিষ্ঠানটির সার বিতরণ বন্ধ ছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। এরপর আবার প্রতিষ্ঠানটিকে সার দেওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
ইউনিয়ন পর্যায়েও অভিযোগ
শুধু উপজেলা পর্যায়ের ডিলার নয়, ইউনিয়ন পর্যায়ের ডিলারদের বিরুদ্ধেও জেলার বাইরে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
উজানচর ইউনিয়নের ডিলার নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফরিদপুরের ঈশান গোপালপুর এলাকায় সার বিক্রির অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কৃষক। তবে নজরুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘কৃষকরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিচ্ছেন। আমি তাদের কাছে কীটনাশক বিক্রি করলেও সার বিক্রি করি না।’
ছোট ভাকলা ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা সপ্তবর্ণা ট্রেডার্সের বিরুদ্ধেও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় খুচরা বিক্রেতাদের কাছে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে সাহা ট্রেডার্সের বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, ‘বস্তাপ্রতি বাড়তি টাকা না দিলে অনেক সময় ডিলাররা সার দিতে চান না। আবার সার নেই বলে জানিয়ে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দেওয়া হয়।’
তাদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৫০ টাকা দামের এমওপি সারের প্রতি বস্তায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে বাড়তি দামের চাপ শেষ পর্যন্ত কৃষকের ওপরই পড়ছে।
কাগজে সংকট নেই, মাঠে সার নেই?
কৃষকদের অভিযোগ, জেলা ও উপজেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির নিয়মিত সভায় সারের সংকট নেই বলে জানানো হলেও মাঠের চিত্র ভিন্ন। প্রয়োজনের সময় ডিলারের দোকানে গিয়ে অনেক কৃষক সার পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে তাদের বেশি দামে খোলা বাজার থেকে সার কিনতে হচ্ছে।
কৃষকদের প্রশ্ন, সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ থাকার পরও বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে কেন? কৃষকের জন্য বরাদ্দ সার যদি অন্য জেলায় চলে যায়, তাহলে সেই সার পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর নজরদারি করছে কারা?
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সার বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিলারদের গুদাম, মজুত রেজিস্টার, বিক্রয় রসিদ, পরিবহন চালান এবং প্রকৃত কৃষকের কাছে সার বিক্রির তথ্য নিয়মিত যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
গোয়ালন্দ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘সার ছিনতাই করে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মন্ডল ট্রেডার্সকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে।’
তবে কৃষকদের দাবি, শুধু মনিটরিং জোরদারের ঘোষণা নয়—সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগগুলো দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এতে আমন মৌসুমে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সরকারি সার বিতরণ ব্যবস্থার ওপর কৃষকের আস্থাও ফিরবে বলে মনে করছেন তারা।





