একটি ঘরজুড়ে ছেলের স্মৃতি। দেয়ালে টাঙানো ছোটবেলার ছবি, চোখের সামনে ভেসে ওঠে বেড়ে ওঠার দিনগুলো। অথচ সেই ঘরের একমাত্র সন্তানটি আর ফিরবে না। ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর শোকে ভেঙে পড়েছেন তাঁর বাবা-মা।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের কাছে অপ্রতীম ছিল একমাত্র সন্তান। ছেলেকে হারানোর পর থেকে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন তিনি। কথা বলতে গেলেই মনে পড়ছে সন্তানের কথা, চোখের পানি থামছে না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদা বলেন, ‘আমার তো সব শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব।’ একমাত্র সন্তানকে এভাবে হারানোর ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না তিনি। অপ্রতীমের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে বিচার দাবি করেছেন এই মা।

অপ্রতীমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ ও সরঞ্জামের ব্যবসা করেন। ছেলেকে হারিয়ে তিনিও অনেকটা বাকরুদ্ধ। কথা বলতে গিয়ে বারবার থেমে যাচ্ছিল তাঁর কণ্ঠ।

1000125715.jpg

শুক্রবার দুপুরের শেষ দেখা হওয়ার কথা মনে করে ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, সেদিন ছেলেকে খাবার খাইয়ে বাইরে যেতে নিষেধ করেছিলেন। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে যাওয়ার কথা বলে অপ্রতীম বাসা থেকে বেরিয়ে যায়।

সেটিই যে ছেলের সঙ্গে তাঁর শেষ দেখা হবে, তা তখন কেউ ভাবতে পারেনি।

অপ্রতীম আর বাসায় ফেরেনি। পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। পরে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। পুলিশসহ বিভিন্নজনের সহযোগিতায় সন্ধান চালানো হলেও অপ্রতীমকে পাওয়া যাচ্ছিল না।

অবশেষে শনিবার দুপুরে আসে সেই দুঃসংবাদ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহে, বিশেষ করে মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ঘটনায় একজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার যে বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে অপ্রতীমের বেড়ে ওঠা, সেখানে এখন কেবল শোকের আবহ। দরজার পাশে লেখা ‘অপ্রতীমদের বাসা’—কয়েকটি শব্দ যেন এই পরিবারের সঙ্গে ছেলেটির গভীর সম্পর্কের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

অপ্রতীম ছিল বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফেরদৌসী জাহান জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে অপ্রতীম ওই বিদ্যালয়ে পড়ছিল। পড়াশোনায় ভালো, শান্ত ও মিশুক স্বভাবের শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষক-সহপাঠীদের কাছে পরিচিত ছিল সে।

যে বয়সে একটি শিশুকে ঘিরে বাবা-মা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন, সেই বয়সেই থেমে গেল অপ্রতীমের জীবন। ঘরের প্রতিটি স্মৃতি এখন বাবা-মায়ের কাছে আনন্দের নয়, বরং গভীর শোকের কারণ।

ছেলেকে হারিয়ে বাবা-মায়ের এখন একটাই প্রত্যাশা—অপ্রতীমের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হোক এবং ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হোক।