কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সংক্ষেপে AI—মানুষের তৈরি এমন এক প্রযুক্তি, যা এখন আর শুধু মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা তথ্য খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি লিখছে, ছবি তৈরি করছে, কোড লিখছে, তথ্য বিশ্লেষণ করছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে এবং ধীরে ধীরে এমন সব কাজ করতে সক্ষম হচ্ছে, যেগুলো একসময় কেবল মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতো। প্রযুক্তির এই অভাবনীয় অগ্রগতি একদিকে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলছে, অন্যদিকে সামনে নিয়ে আসছে এক গভীর প্রশ্ন—মানুষ কি একসময় নিজের সৃষ্ট প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলতে পারে?
এই প্রশ্ন এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। বরং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরাই এ নিয়ে প্রকাশ্যে উদ্বেগ জানাচ্ছেন। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী ড্যারিও আমোদেই এআই উন্নয়নের গতি কিছুটা ধীর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, এআই উন্নয়ন বন্ধ করা নয়; বরং প্রযুক্তির সক্ষমতা যত দ্রুত বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির জন্য মানুষকে সময় দিতে হবে।
এখানেই মূল সংকট। আমরা কি প্রযুক্তির ক্ষমতা বাড়ানোর দৌড়ে নিরাপত্তার প্রশ্নটি পিছনে ফেলে দিচ্ছি?
সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিকের প্রকাশিত Threat Intelligence Report এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেদনে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এআই ব্যবহারের চেষ্টা, সাইবার হামলা, প্রতারণা, নজরদারি এবং অস্ত্র তৈরির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে এর সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয় উঠে এসেছে। অর্থাৎ এআই কেবল ভালো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে না; অপরাধীরাও এর সক্ষমতাকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।
আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করছে এআই এজেন্টের স্বায়ত্তশাসিত সক্ষমতা। একটি সাধারণ সফটওয়্যার নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে। কিন্তু এআই এজেন্টকে যদি একটি লক্ষ্য দেওয়া হয় এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তাকে নিজেই একাধিক ধাপ নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়, তখন মানুষের সরাসরি নজরদারি কমে যেতে পারে। প্রশ্ন তখন শুধু ‘এআই কী উত্তর দিচ্ছে?’ নয়; বরং ‘এআই নিজে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে?’—এই প্রশ্নটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
এখানে আরেকটি ঝুঁকি হলো ভুল তথ্য। এআই অনেক সময় অসম্পূর্ণ বা ভুল তথ্যকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করতে পারে। সাধারণ ব্যবহারকারীর পক্ষে সেই তথ্য যাচাই করা সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে এআইয়ের ভুল যদি ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার প্রভাবও বড় হতে পারে।
এআই নিরাপত্তা নিয়ে অ্যানথ্রোপিকের কিছু গবেষক মানবজাতির অস্তিত্বের ওপরও সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা বলেছেন। তবে এমন আশঙ্কাকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা ও অনুমানের অংশ। কিন্তু সম্ভাবনাটি নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোনো প্রযুক্তির ঝুঁকি যখন তার প্রভাবের তুলনায় অনেক বড় হতে পারে, তখন ঝুঁকি ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
এআইয়ের আরেকটি বড় প্রভাব পড়তে পারে কর্মসংস্থানে। অফিসভিত্তিক বিভিন্ন কাজের একটি অংশ ইতোমধ্যে অটোমেশনের দিকে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এআই আরও সক্ষম হলে হিসাব, কনটেন্ট তৈরি, গ্রাহকসেবা, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রাথমিক গবেষণা কিংবা প্রশাসনিক কাজের মতো অনেক ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজনীয়তা কমতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে সব চাকরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বরং কাজের ধরন বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু পরিবর্তনের গতি যদি মানুষের নতুন দক্ষতা অর্জনের গতির চেয়ে বেশি হয়, তাহলে শ্রমবাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বদলাতে হবে। শুধু মুখস্থনির্ভর শিক্ষা নয়, মানুষের সৃজনশীলতা, নৈতিক বিচারবোধ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার চেয়ে এআইকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার সক্ষমতাই হয়তো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
তবে এআই উন্নয়নের গতি কমানো নিয়েও রয়েছে ভিন্ন মত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান যদি উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়, অন্যরা এগিয়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে একদিকে নিরাপত্তা, অন্যদিকে প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা—দুই বিপরীত চাপের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের।
এখানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান বা একটি দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এআই যদি সীমান্ত মানে না, তাহলে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও কেবল জাতীয় সীমারেখার মধ্যে আটকে থাকতে পারে না। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে নিরাপত্তার মানদণ্ড, স্বাধীন পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে অত্যন্ত শক্তিশালী এআই মডেল তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রযুক্তির উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সক্ষমতা বাড়ানো, মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা নয়। এআই যতই শক্তিশালী হোক, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও জবাবদিহি যেন হারিয়ে না যায়—সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
আমরা এমন এক সময়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যখন মানুষের তৈরি প্রযুক্তিই মানুষের কাজের ধরন, তথ্যের জগৎ এবং সামাজিক কাঠামো বদলে দিতে পারে। তাই প্রশ্নটি কেবল ‘AI কতটা বুদ্ধিমান হবে?’—এতে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—AI যত বুদ্ধিমান হবে, মানুষ কি ততটাই দায়িত্বশীল হবে?
প্রযুক্তির অগ্রগতি থামানো সম্ভবত বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু তার গতি, ব্যবহার এবং সীমা নির্ধারণ করা মানুষের হাতেই থাকা উচিত। কারণ ভবিষ্যৎ শুধু উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হবে না; ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তিকে মানুষ কতটা নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে পারে তার ওপর।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন AI মানুষকে ছাড়িয়ে যাবে কি না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, AI এগিয়ে যাওয়ার সময় মানুষ কি নিজের নিয়ন্ত্রণ, বিবেক ও দায়িত্ববোধ ধরে রাখতে পারবে?

লেখিকা: কেয়া আক্তার
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় - ঢাকা





