সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। তথ্য, শিক্ষা, সংবাদ, বিনোদন কিংবা জনসচেতনতা—সবকিছুরই সহজলভ্য প্ল্যাটফর্ম এখন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ নানা মাধ্যম। একটি ভালো কনটেন্ট যেমন মুহূর্তে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে, তেমনি একটি দায়িত্বহীন কনটেন্টও একই গতিতে ছড়িয়ে দিতে পারে নেতিবাচকতা। তাই কনটেন্ট তৈরির স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধের প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, ভিউ ও ফলোয়ারের প্রতিযোগিতায় সেই দায়িত্ববোধ অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যাচ্ছে। আজ সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে দেখলাম দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন কিছু কনটেন্ট দেখা যাচ্ছে, যেখানে সৃজনশীলতার চেয়ে সস্তা জনপ্রিয়তার আকাঙ্ক্ষাই বেশি দৃশ্যমান। রাস্তাঘাট, বাজার, নদীর পাড় কিংবা জনসমাগমস্থল—কোনো জায়গাই যেন বাদ যাচ্ছে না। অপ্রাসঙ্গিক অভিনয়, অযাচিত হাস্যরস, মানুষকে নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা কিংবা সামান্য ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করে ভিডিও বানিয়ে ভিউ সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

1000118645.png

এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই-

কয়েক হাজার ভিউয়ের বিনিময়ে আমরা কি আমাদের সামাজিক রুচি ও বিবেককে বিসর্জন দেব?

কনটেন্ট তৈরি অপরাধ নয়; বরং এটি তরুণদের জন্য সম্ভাবনাময় একটি সৃজনশীল ক্ষেত্র। একজন তরুণ নিজের মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কনটেন্টের মাধ্যমে পরিচিতি তৈরি করতে পারেন, আয় করতে পারেন এবং সমাজের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু জনপ্রিয়তার শর্টকাট পথ হিসেবে অন্যকে বিব্রত করা, ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রকাশ্যে আনা কিংবা জনজীবনের স্বাভাবিক পরিবেশকে বিনোদনের উপকরণ বানানো কোনো সৃজনশীলতার পরিচয় নয়।

ভিউ পাওয়া যায় কয়েক সেকেন্ডের কৌশলে; কিন্তু বিশ্বাস অর্জন করতে সময় লাগে। একটি ভিডিও মুহূর্তের জন্য ভাইরাল হতে পারে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম যখন এসব কনটেন্ট দেখে, তখন তাদের রুচি ও সামাজিক আচরণেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে একজন কনটেন্ট নির্মাতা শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানো একজন ব্যক্তি নন; তিনি অজান্তেই একটি সামাজিক প্রভাব তৈরি করছেন।

অথচ আমাদের চারপাশেই রয়েছে অসংখ্য গল্প। নদীভাঙনে ঘর হারানো মানুষের জীবন, কৃষকের ঘাম, গ্রামের ঐতিহ্য, স্থানীয় ইতিহাস, প্রকৃতির সৌন্দর্য, শিক্ষার্থীদের সাফল্য, তরুণ উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম, নাগরিক সমস্যার বাস্তব চিত্র—এসব নিয়েও অসাধারণ কনটেন্ট তৈরি করা যায়। এতে যেমন দর্শক বিনোদন ও তথ্য পাবেন, তেমনি একজন নির্মাতার কাজও হয়ে উঠবে অর্থবহ।তরুণ ও তরুণদের জন্য এই সম্ভাবনা আরও বড়।

নদী, প্রকৃতি, কৃষি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনযাপনকে কেন্দ্র করে তারা চাইলে এমন কনটেন্ট তৈরি করতে পারেন, যা শুধু ভিউ নয়—দেশের জন্যও একটি ইতিবাচক পরিচিতি তৈরি করবে। স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করাও হতে পারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের অন্যতম সার্থকতা।

তবে দায় শুধু কনটেন্ট নির্মাতাদের নয়। দর্শকরাও এর অংশীদার। আমরা যে কনটেন্ট দেখি, লাইক দিই, শেয়ার করি কিংবা মন্তব্য করি—তার মাধ্যমেই কোনো কনটেন্ট জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাই নিম্নমানের কনটেন্টকে বিনোদনের নামে উৎসাহিত করার প্রবণতা বন্ধ না হলে শুধু নির্মাতাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ভিউ কোনো সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। ফলোয়ারের সংখ্যা একজন নির্মাতার জনপ্রিয়তা বোঝাতে পারে, কিন্তু তার কাজের মূল্য নির্ধারণ করে না। একজন নির্মাতার প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তার কনটেন্ট মানুষকে ভাবায়, শেখায়, আনন্দ দেয় কিংবা সমাজের কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে।

তরুণদের আমরা থামাতে চাই না; বরং চাই তারা আরও বেশি সৃষ্টি করুক। কিন্তু সেই সৃষ্টিতে থাকুক রুচি, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ভিউয়ের প্রতিযোগিতার মাঠ না বানিয়ে জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও জনকল্যাণের শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।

ভিউ সাময়িক। ফলোয়ারও একসময় কমে যেতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের ভালো কাজ, ভালো পরিচয় ও মানুষের অর্জিত আস্থা দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে।

তাই সময় এসেছে প্রশ্নটি নতুন করে করার—আমরা কি শুধু ভাইরাল হতে চাই, নাকি মানুষের মনে জায়গা করে নিতে চাই?

আমাদের প্রত্যাশা একটাই—
ভিউয়ের নেশা নয়, বিবেকের চর্চা হোক; সস্তা জনপ্রিয়তা নয়, দায়িত্বশীল সৃজনশীলতাই হোক তরুণদের পরিচয়।

লেখক - দুর্গেশ সরকার,বাপ্পী

সংবাদকর্মী