দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত, রক্তের অভাবে সংকটাপন্ন মা ও অনাগত শিশুর জীবন সন্তান জন্মের অপেক্ষায় পরিবারে যখন আনন্দের আবহ, তখনই সেই আনন্দ বিষাদে পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুর ইউনিয়নের পাতনি গ্রামের তানজিনা বেগমের পরিবারে। মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হলেও কাঙ্ক্ষিত রক্ত মিলছিল না। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী। নিজের শরীরের রক্ত দিয়ে তিনি বাঁচানোর চেষ্টা করেন এক প্রসূতি মা ও তার অনাগত সন্তানের জীবন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পাতনি গ্রামের শালিকুর রহমান ও তানজিনা বেগম দম্পতির সংসারে প্রথম সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় ছিল পরিবার। সংসারের স্বচ্ছলতার আশায় শালিকুর রহমান কিছুদিন আগে প্রবাসে পাড়ি জমান। এরই মধ্যে তানজিনা বেগমের প্রসববেদনা উঠলে রোববার সকালে স্বজনরা তাকে গোয়াইনঘাট কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করেন।
হাসপাতালে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, প্রসূতি ও গর্ভস্থ শিশুর জীবন রক্ষায় দ্রুত রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু জরুরি মুহূর্তে প্রয়োজনীয় গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না। এতে উৎকণ্ঠায় পড়ে যান রোগীর স্বজনরা।
রক্তের অভাবে যখন প্রসূতি মায়ের জীবন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, তখন বিষয়টি জানতে পারেন গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী। খবর পেয়েই তিনি দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান এবং নিজেই রক্তদান করেন।
রোববার সন্ধ্যায় ইউএনওর এই মানবিক উদ্যোগে স্বস্তি ফিরে আসে রোগীর স্বজনদের মধ্যে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে গিয়ে সংকটাপন্ন একজন মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রক্ত দেওয়ার ঘটনায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন পরিবারের সদস্যরা।
রোগীর মা জুলেখা বেগম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “ডাক্তার যখন জরুরি রক্তের কথা বললেন, আমরা খুব দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। কোথাও রক্ত পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল মেয়েটাকে হয়তো আর বাঁচাতে পারব না। ঠিক তখনই ইউএনও স্যার এসে নিজের রক্ত দিয়ে আমার মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমরা কোনোদিন এই উপকার ভুলব না। আল্লাহ ওনার মঙ্গল করুন।”
গোয়াইনঘাট কেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক শায়লা ইসলাম স্বর্ণা বলেন, “রোগীর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ছিল। ওই মুহূর্তে রক্ত না পেলে প্রসূতি ও নবজাতক—উভয়েরই প্রাণসংশয় হতে পারত। ইউএনও স্যার খবর পেয়ে দ্রুত হাসপাতালে এসে রক্ত দিয়ে যে মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।”
নিজের রক্তদানের বিষয়ে ইউএনও রতন কুমার অধিকারী বলেন, “প্রশাসনিক দায়িত্ব তো রয়েছেই, তবে তার চেয়ে বড় পরিচয়—আমরা প্রত্যেকেই মানুষ। একজন মুমূর্ষু মা ও তার অনাগত সন্তানের সংকটের কথা শুনে আমি স্থির থাকতে পারিনি। তখন দাপ্তরিক কাজের চেয়ে একটি জীবন বাঁচানোই আমার কাছে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মনে হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নাগরিক সেবা এবং যেকোনো মানবিক সংকটে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক কর্তব্য। মা ও শিশু দুজনেই সুস্থ থাকুক—এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।”
একজন সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্বের গণ্ডি পেরিয়ে এমন মানবিক উদ্যোগে গোয়াইনঘাটে প্রশংসা কুড়িয়েছেন ইউএনও রতন কুমার অধিকারী। মুমূর্ষু প্রসূতি মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে রক্তদানের এই ঘটনা প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিকতারও এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য কিছু দিন আগে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক।লেংগুড়া গ্রামের আবদুল হামিদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী জুলফা বেগমক গোয়াইনঘাট কেয়ার হাসপাতালে গিয়ে প্রসূতির জীবন বাঁচাতে দিলেন রক্ত।




