একই দেশের মানচিত্রে কোথাও হাসপাতালের দীর্ঘ সারি, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট; আবার কোথাও সামান্য চিকিৎসার জন্যও মানুষকে ছুটতে হয় বহু দূরের শহরে। কোথাও শিশুর পড়াশোনার জন্য রয়েছে নানা সুযোগ, কোথাও একটি বই কিংবা ভালো শিক্ষকের অভাবই তার স্বপ্নের পথে প্রথম বাধা। পৃথিবী যোগাযোগের দিক থেকে যত ছোট হয়েছে, মানুষের জীবনের সুযোগগুলো কি ততটাই সমান হয়েছে?
বিশ্বায়ন আমাদের জীবনকে অভাবনীয়ভাবে বদলে দিয়েছে। তথ্য এখন সীমান্ত মানে না, জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ছে মুহূর্তে, ব্যবসা পৌঁছে যাচ্ছে এক দেশ থেকে আরেক দেশে। প্রযুক্তি মানুষের সামনে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দরজা। কিন্তু দরজা খোলা আর সবার সেই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারা—দুটি এক বিষয় নয়। কারণ মানুষের জীবনের শুরুটা সমান জায়গা থেকে হয় না।
কেউ জন্ম থেকেই পায় ভালো শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা, প্রযুক্তির সহজ নাগাল ও আর্থিক নিরাপত্তা। অন্যদিকে কেউ বেড়ে ওঠে এমন পরিবেশে, যেখানে প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটানোই বড় সংগ্রাম। ফলে মেধা ও স্বপ্নে কাছাকাছি হয়েও দুজন মানুষের ভবিষ্যৎ এক পথে এগোয় না। এখানেই বৈষম্যের গভীরতা।
শিক্ষায় বৈষম্যের চিত্র
শিক্ষাক্ষেত্রে এই বৈষম্যের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট। শহরের নামী স্কুল-কলেজে সন্তানকে পড়ানোর জন্য পরিবারগুলো অনেক দূর থেকেও শহরমুখী হয়। কারণ তারা জানে, ভালো শিক্ষার সঙ্গে ভবিষ্যতের অনেক দরজা খুলে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভালো শিক্ষার জন্য বারবার শহরের দিকে তাকাতে হবে কেন? গ্রামের বিদ্যালয়গুলো কেন এমন মানসম্পন্ন হয়ে উঠবে না, যেখানে একজন শিক্ষার্থী নিজের মাটিতে থেকেই স্বপ্নকে বড় করতে পারে?
চিকিৎসার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। জটিল রোগ হলে মানুষ ছুটে যায় শহরের বড় হাসপাতালের দিকে। কারণ উন্নত চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কিংবা প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার বড় অংশই শহরকেন্দ্রিক। এতে শুধু অর্থের খরচ বাড়ে না; সময়, যাতায়াত এবং মানসিক চাপও যুক্ত হয়।
অথচ একজন গ্রামীণ মানুষের অসুস্থ হওয়ার অধিকার যেমন শহরের মানুষের মতোই, তেমনি মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার অধিকারও সমান।
উন্নয়ন কি শুধু শহরকেন্দ্রিক?
এখানে আমাদের নিজেদের মানসিকতার দিকটিও ভাবতে হয়। আমরা কি উন্নয়নকে ছড়িয়ে দিই, নাকি যেখানে আগে থেকেই কিছুটা উন্নয়ন আছে, সেখানেই আরও বেশি বিনিয়োগ করি?
ভালো হাসপাতাল আছে—সেখানেই আরও বড় হাসপাতাল। ভালো প্রতিষ্ঠান আছে—সেখানেই আরও নামী প্রতিষ্ঠান। কর্মসংস্থান আছে—সেখানেই নতুন কর্মসংস্থানের কেন্দ্র। ফলে মানুষও স্বাভাবিকভাবেই সেই কেন্দ্রগুলোর দিকে ছুটে যায়। শহর আরও বড় হয়, আর প্রান্তিক অঞ্চল আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
অথচ প্রতিভার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। গ্রামের একটি ছোট ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীর মেধা হয়তো শহরের কোনো শিক্ষার্থীর চেয়ে কম নয়। পার্থক্য তৈরি হয় তার চারপাশের পরিবেশে। একজনের সামনে দরজা থাকে অনেক, অন্যজনকে হয়তো একটি দরজার জন্যই বহু দূর যেতে হয়।
তাই বৈষম্য সবসময় মানুষের যোগ্যতার ফল নয়; অনেক সময় এটি সুযোগের অসম বণ্টনের ফল।
প্রযুক্তি: সম্ভাবনা ও নতুন বিভাজন
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই বৈপরীত্য দেখা যায়। বিশ্ব যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা ও ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষ এখনো নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রয়োজনীয় ডিভাইস কিংবা ডিজিটাল দক্ষতার বাইরে।
ফলে প্রযুক্তি যেখানে মানুষের দূরত্ব কমানোর কথা, সেখানেও তৈরি হচ্ছে নতুন বিভাজন—যারা প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে এবং যারা পারে না, তাদের মধ্যে।
অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন নতুন কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এর সুফল সমানভাবে বণ্টিত না হলে প্রবৃদ্ধি নিজেই বৈষম্য কমানোর বদলে কখনো তা আরও দৃশ্যমান করে।
বড় শহরের দক্ষ জনশক্তি ও অবকাঠামো যখন ক্রমাগত বিনিয়োগ আকর্ষণ করে, তখন ছোট শহর ও গ্রাম পিছিয়ে পড়ে। ফলে কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের শহরমুখী হতে হয়, পরিবার থেকে দূরে যেতে হয়, কখনো নিজের শিকড়ও ছেড়ে দিতে হয়।
দায় শুধু বিশ্বায়নের নয়
তবে এই সমস্যার সব দায় বিশ্বায়নের ওপর চাপিয়ে দিলে সমাধান পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রীয় নীতি, সম্পদের অসম বণ্টন, দুর্বল অবকাঠামো, শিক্ষার বৈষম্য, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং অতিরিক্ত নগরকেন্দ্রিক উন্নয়ন—সব মিলেই এই ব্যবধান তৈরি করে।
বিশ্বায়ন কখনো সেই ব্যবধানকে বাড়িয়ে তোলে, আবার সঠিক পরিকল্পনা থাকলে তা কমানোর সুযোগও তৈরি করে।
তাই মুক্তির পথ বিশ্বায়ন থেকে পিছিয়ে যাওয়া নয়; বরং এর সুফলকে সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া।
মুক্তির পথ কোথায়?
প্রথমেই প্রয়োজন বিকেন্দ্রীকরণ। সব উন্নয়নকে কয়েকটি বড় শহরের মধ্যে আটকে না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সেবা গড়ে তুলতে হবে। একটি ভালো হাসপাতাল কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য মানুষকে যেন বাধ্য হয়ে রাজধানী বা বড় শহরে ছুটতে না হয়।
শিক্ষার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক পাঠদান, লাইব্রেরি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুবিধা এবং ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ। প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীকে এমন পরিবেশ দিতে হবে, যাতে তার স্বপ্নের পরিধি তার এলাকার সীমারেখায় আটকে না থাকে।
প্রযুক্তির সুযোগও পৌঁছে দিতে হবে প্রান্তিক মানুষের কাছে। সুলভ ইন্টারনেট, ডিজিটাল ডিভাইস এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে গ্রামের একজন তরুণও ঘরে বসে বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। তখন প্রযুক্তি শুধু শহরের সুবিধা থাকবে না; হয়ে উঠবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমতার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরি করা জরুরি। সব তরুণকে চাকরির জন্য শহরে আসতে হলে নগরায়ণের চাপ যেমন বাড়বে, তেমনি গ্রামের অর্থনীতিও দুর্বল হবে। স্থানীয় শিল্প, কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং ও অন্যান্য নতুন কর্মক্ষেত্রকে বিকশিত করা গেলে মানুষ নিজের এলাকাতেই অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি দরকার সুষম বিনিয়োগ ও সামাজিক নিরাপত্তা। যে অঞ্চলে দীর্ঘদিন অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে, সেখানে শুধু সমান বিনিয়োগ করলেই হবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি বিনিয়োগ করতে হবে।
কারণ সবাইকে একই জিনিস দেওয়া আর সবাইকে সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার অবস্থানে নিয়ে আসা এক কথা নয়।
বদলাতে হবে উন্নয়নের ধারণা
সবশেষে প্রয়োজন আমাদের উন্নয়ন-ভাবনার পরিবর্তন। উন্নয়ন মানে শুধু উঁচু ভবন, বড় রাস্তা কিংবা ব্যস্ত নগর নয়। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তার সুফল পৌঁছে যায় সেই মানুষটির কাছেও, যে এখনো উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে আসে, ভালো শিক্ষার জন্য সন্তানকে দূরে পাঠায় কিংবা কাজের সন্ধানে নিজের গ্রাম ছেড়ে যায়।
সবাইকে শহরে টেনে এনে উন্নয়ন করার চেয়ে, গ্রামের মাটিতেই এমন সম্ভাবনা তৈরি করা কি বেশি জরুরি নয়—যাতে উন্নতির জন্য কাউকে নিজের শিকড় ছেড়ে ছুটতে না হয়?
কারণ শেষ পর্যন্ত বিশ্বায়নের সার্থকতা শুধু পৃথিবীকে কাছাকাছি আনার মধ্যে নয়; এর প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন মানুষের জন্মস্থান কিংবা আর্থিক সামর্থ্য তার সম্ভাবনার পথে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না।
কামনা মীম
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা



