প্রকৃতি কখনো কথা বলে নীরবতায়, কখনো গর্জনে। কখনো সে মানুষকে সময় দেয় প্রস্তুত হওয়ার, আবার কখনো এক মুহূর্তেই মনে করিয়ে দেয়—এই পৃথিবীতে মানুষ যতই শক্তিশালী হওয়ার দাবি করুক, প্রকৃতির কাছে তার ক্ষমতা এখনো সীমিত।
ইন্দোনেশিয়ার সুনদা প্রণালিতে অবস্থিত আনাক ক্রাকাতাউয়ের সাম্প্রতিক অগ্ন্যুৎপাত যেন সেই বাস্তবতারই আরেকটি নির্মম স্মারক। আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে উঠে আসা ছাই শুধু আকাশকে অন্ধকার করেনি; থমকে দিয়েছে বিমান চলাচল, ব্যাহত করেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, তৈরি করেছে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি। কয়েক ঘণ্টার একটি প্রাকৃতিক ঘটনা কীভাবে একটি দেশের যোগাযোগব্যবস্থা থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে, আনাক ক্রাকাতাউ তারই জীবন্ত উদাহরণ।
ছাইয়ের মেঘে থমকে গেল আকাশ
সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আনাক ক্রাকাতাউয়ে আগ্নেয় কার্যক্রম বাড়তে থাকে। ৬ সেপ্টেম্বর অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয় ছাইয়ের মেঘ পশ্চিম ইন্দোনেশিয়ার আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও ছাইয়ের ঘনত্ব এতটাই বেড়ে যায় যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে বিমান চলাচলে। আগ্নেয় ছাই বিমানের ইঞ্জিনের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। সূক্ষ্ম ছাইয়ের কণা ইঞ্জিনে প্রবেশ করলে এর কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তাই যাত্রীদের অসুবিধা হলেও নিরাপত্তার স্বার্থে একাধিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়।
জাকার্তার গুরুত্বপূর্ণ সোকার্নো-হাত্তা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও এর প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি। প্রাথমিকভাবে আটটি বিমানবন্দরে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়। ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার যাত্রী এবং ১,৫৫৮টি ফ্লাইট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। পরবর্তী হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়—৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ৪১ হাজার যাত্রী এবং ২,৯৬১টি ফ্লাইট এই পরিস্থিতির প্রভাবে পড়ে।
একটি আগ্নেয়গিরির ছাই যে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাকেও মুহূর্তে অচল করে দিতে পারে, এই ঘটনা তারই প্রমাণ।
‘ক্রাকাতাউয়ের সন্তান’, যার ইতিহাসে বিপর্যয়ের স্মৃতি
আনাক ক্রাকাতাউ নামের অর্থ—‘ক্রাকাতাউয়ের সন্তান’। নামের মধ্যেই যেন তার জন্মের ইতিহাস লুকিয়ে আছে।
১৮৮৩ সালের ভয়াবহ ক্রাকাতাউ অগ্ন্যুৎপাত পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত আগ্নেয় দুর্যোগ। সেই বিপর্যয়ের পর ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় সুনদা প্রণালিতে নতুন আগ্নেয় দ্বীপের জন্ম হয়। সেটিই পরবর্তীতে আনাক ক্রাকাতাউ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
কিন্তু এই ‘সন্তান’-এর ইতিহাসও কম ভয়ংকর নয়।
২০১৮ সালে আনাক ক্রাকাতাউয়ের অগ্ন্যুৎপাতের পর আগ্নেয়গিরির একটি অংশ সমুদ্রে ধসে পড়ে। এর ফলে ভয়াবহ সুনামি আঘাত হানে উপকূলীয় এলাকায়। শত শত মানুষ প্রাণ হারান। বহু পরিবার হারায় তাদের প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার অবলম্বন।
তাই আনাক ক্রাকাতাউ যখন আবার জেগে ওঠে, তখন মানুষের মনে শুধু আগুন আর ছাইয়ের ভয় থাকে না; ফিরে আসে সমুদ্রের সেই ভয়ংকর স্মৃতিও।
তবে এবারের অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনায় তাৎক্ষণিক কোনো সুনামির সতর্কতা জারি হয়নি।
আগ্নেয় ছাইয়ের আড়ালে মানুষের আরেক সংকট
অগ্ন্যুৎপাতের দৃশ্য হয়তো দূর থেকে রোমাঞ্চকর। কিন্তু সেই সৌন্দর্যের আড়ালে থাকে মানুষের জন্য নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
আগ্নেয় ছাই বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে চোখে জ্বালা, ত্বকে অস্বস্তি এবং শ্বাসতন্ত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টে ভোগা মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি হতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষকে প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়।
এর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। শিক্ষা কার্যক্রম, মৎস্য আহরণ, পর্যটন, স্থানীয় ব্যবসা ও মানুষের দৈনন্দিন কর্মজীবনও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
একটি বিমানবন্দর বন্ধ হলে শুধু যাত্রীরাই আটকে পড়েন না। থেমে যায় ব্যবসায়িক সফর, পর্যটন, পণ্য পরিবহন এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের একটি বড় অংশ। ফলে একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সংকটেও রূপ নিতে পারে।
প্রকৃতিকে জয় নয়, বুঝতে হবে
মানুষ চাঁদে পৌঁছেছে, সমুদ্রের গভীরে নেমেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—প্রকৃতিকে কি মানুষ সত্যিই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে?
আনাক ক্রাকাতাউয়ের উত্তর খুব স্পষ্ট—না।
প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তবে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রকৃতির আঘাতের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের অন্যতম আগ্নেয়গিরিপ্রবণ দেশ। ‘প্যাসিফিক রিং অব ফায়ার’-এর অংশ হওয়ায় দেশটিতে ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম নিয়মিত দেখা যায়। তাই সেখানে ভূতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ, আগাম সতর্কতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের সচেতনতা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ—বিমান চলাচল স্থগিত করা, ছাইয়ের গতিপথ পর্যবেক্ষণ এবং পরিস্থিতি উন্নত হলে বিমানবন্দর পুনরায় চালু করা—দেখিয়ে দিয়েছে, দুর্যোগের মুহূর্তে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
সংকটের সময়ে সাংবাদিকতার পরীক্ষা
প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় গণমাধ্যমের দায়িত্ব অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
কারণ দুর্যোগের সময় মানুষ যেমন সঠিক তথ্যের জন্য সংবাদমাধ্যমের দিকে তাকিয়ে থাকে, তেমনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
‘সুনামি আসছে’, ‘হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে’—এ ধরনের যাচাইহীন তথ্য মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে দিতে পারে। একটি ভুল তথ্য কখনো কখনো দুর্যোগের চেয়েও বড় সামাজিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
তাই দুর্যোগের সময় সাংবাদিকতার মূলনীতি হওয়া উচিত—আতঙ্ক নয়, তথ্য; গুজব নয়, যাচাই; বিভ্রান্তি নয়, দিকনির্দেশনা।
কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি, কোথায় যাওয়া উচিত নয়, বিমান চলাচলের পরিস্থিতি কী, কর্তৃপক্ষ কী নির্দেশনা দিয়েছে, নতুন কোনো সতর্কতা জারি হয়েছে কি না—এসব তথ্য মানুষের কাছে দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পৌঁছে দেওয়া গণমাধ্যমের দায়িত্ব।
সাংবাদিকের কাজ শুধু ঘটনা জানানো নয়; সংকটের সময়ে মানুষকে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো তথ্যও দেওয়া।
বাংলাদেশের জন্যও একটি শিক্ষা
আনাক ক্রাকাতাউয়ের অগ্ন্যুৎপাত ইন্দোনেশিয়ার ঘটনা হলেও এর শিক্ষা বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও ভূমিকম্পসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের ধরন ও তীব্রতাও ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে।
তাই আমাদেরও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় শুধু দুর্যোগের পর উদ্ধারকাজের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস, দ্রুত সতর্কতা প্রচার, স্থানীয় পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বন্ধ করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কতটা হবে, তার বড় একটি অংশ নির্ভর করে আমাদের প্রস্তুতির ওপর।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই ভবিষ্যতের পথ
আনাক ক্রাকাতাউ আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিল—মানুষ প্রকৃতির মালিক নয়, বরং প্রকৃতিরই একটি অংশ।
প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, কিন্তু প্রকৃতির শক্তিকে অস্বীকার করার ক্ষমতা দেয়নি। বরং প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তা মানুষকে প্রকৃতির ঝুঁকি বুঝতে, আগাম সতর্ক হতে এবং নিরাপদ থাকতে সাহায্য করে।
আনাক ক্রাকাতাউয়ের অগ্ন্যুৎপাত তাই শুধু একটি আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠার ঘটনা নয়। এটি মানবসভ্যতার প্রতি প্রকৃতির আরেকটি সতর্কবার্তা।
প্রকৃতিকে জয় করার অহংকার নয়—প্রকৃতিকে বোঝা, তার শক্তিকে সম্মান করা এবং তার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ খুঁজে নেওয়াই হতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান পথ।
কারণ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থামানো হয়তো মানুষের হাতে নেই; কিন্তু তার আগেই প্রস্তুত হওয়া অবশ্যই মানুষের হাতে।
লেখিকা -সুরাইয়া বিনতে হাসান
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়



