শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা বাড়ছে—পেছনে রয়েছে মানসিক চাপ, একাকিত্ব, পারিবারিক ও সম্পর্কের সংকটসহ নানা কারণ; প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি

সম্প্রতি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড্রয়িং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগের শিক্ষার্থী অনিক চন্দ্র পালের মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর চানখারপুলের একটি মেস থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

সহপাঠী ও মেসসঙ্গীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর আগে অনিক কিছুটা নীরব ও একাকী হয়ে পড়েছিলেন। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল বলে জানা গেছে। তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

অনিকের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাইরুজ সাদাফ অবন্তিকার মৃত্যুও দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর আগে করা অভিযোগে সহপাঠীর হয়রানি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। পরে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বাড়ছে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনা

শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চিত্র নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনের গণমাধ্যমভিত্তিক গবেষণাতেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের ২০২৫ সালের গণমাধ্যমভিত্তিক সমীক্ষায় ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ৩১০। তবে এগুলো সরকারি জাতীয় মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ হিসাব নয়; জাতীয় ও স্থানীয় ১৬৫টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ করে তথ্যগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।

২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, আত্মহত্যার শিকার শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৯০ জন স্কুল, ৯২ জন কলেজ, ৭৭ জন বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৪৪ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ছিলেন। নারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ২৪৯ এবং পুরুষ ১৫৪ জন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত গণমাধ্যমভিত্তিক আরেকটি গবেষণায় ৩৬১ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের বড় একটি অংশের বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছর। গবেষণায় অভিমান, সম্পর্কজনিত সমস্যা, পারিবারিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, পড়াশোনার চাপ ও মানসিক অস্থিরতার মতো বিভিন্ন বিষয় উঠে এসেছে।

তবে এসব তথ্যকে সরকারি জাতীয় পরিসংখ্যান হিসেবে না দেখে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার একটি চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

সংখ্যার পেছনে থাকা মানুষগুলো

একজন শিক্ষার্থীর মানসিক সংকট সাধারণত কোনো একক কারণে তৈরি হয় না। পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় ব্যর্থতার ভয়, পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকিত্ব, সামাজিক অপমান, হয়রানি, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—বিভিন্ন চাপ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতা। নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেক শিক্ষার্থীর জন্য উচ্চশিক্ষা পরিবারের বড় আর্থিক ত্যাগের বিষয়। কেউ টিউশন করে নিজের খরচ চালান, কেউ পরিবার থেকে দূরে মেসে থাকেন। পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়া যাবে কি না, পরিবারকে সহায়তা করা সম্ভব হবে কি না—এসব অনিশ্চয়তাও মানসিক চাপে ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখলে সংকটের বড় একটি অংশ অদৃশ্য থেকে যায়।

মৃত্যুর পরও বাড়ে misinformation

একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় যাচাই না করা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। ভুয়া ফটোকার্ড, সম্পাদিত ছবি, বানানো বক্তব্য কিংবা অনুমাননির্ভর মৃত্যুর কারণ মুহূর্তেই ছড়িয়ে যেতে পারে।

কখনো সম্পর্ক, কখনো পড়াশোনা, কখনো পরিবার বা শিক্ষককে ঘিরে নানা দাবি করা হয়। কিন্তু তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এসব দাবিকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করা হলে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি তাঁর পরিবারও সামাজিক চাপের মুখে পড়তে পারে।

নির্দোষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ভুল অভিযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে শোকাহত সহপাঠীদের মানসিক আঘাত আরও গভীর হতে পারে।

তাই আত্মহত্যার ঘটনা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করার ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, ব্যক্তিগত মর্যাদার প্রতি সম্মান এবং দায়িত্বশীল ভাষা ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিরোধ শুরু হোক পরিবার থেকে

সন্তান খারাপ ফল করলে অপমান নয়, প্রয়োজন সংলাপের। শুধু ‘কত পেয়েছ?’ নয়, ‘কেমন আছ?’—এই প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো শিক্ষার্থী সমস্যার কথা বললে সেটিকে ছোট করে দেখা যাবে না। ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ নয়, বরং একটি সাময়িক পরিস্থিতি হিসেবে বোঝাতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও থাকতে হবে কার্যকর, গোপনীয় ও সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। শিক্ষক ও সহপাঠীদের এমনভাবে সচেতন করা প্রয়োজন, যাতে আচরণে বড় পরিবর্তন বা দীর্ঘস্থায়ী বিচ্ছিন্নতার মতো সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া যায়।

তবে শিক্ষার্থীর আচরণ দেখে নিজেরা রোগ নির্ণয় না করে প্রয়োজন হলে পেশাদার মানসিক স্বাস্থ্যসেবার কাছে পৌঁছে দেওয়াই নিরাপদ পথ।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়

শিক্ষার্থীদের জন্য সাশ্রয়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, আর্থিক সহায়তা এবং সংকটকালীন সহায়তা আরও সহজলভ্য করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে আত্মহত্যা নিয়ে সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট তৈরিতে সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয়

আত্মহত্যাকে কোনো একক ঘটনা বা ব্যক্তিগত দুর্বলতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়। তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সম্পর্কের সংকট, পারিবারিক সমস্যা ও নানা ধরনের চাপ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তাই আত্মহত্যা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আগেভাগে সংকট শনাক্ত করা, মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা এবং প্রয়োজন হলে পেশাদার সহায়তা নিশ্চিত করা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাহায্য চাওয়াকে দুর্বলতা হিসেবে না দেখা।

একটি মৃত্যু, অসংখ্য প্রশ্ন

অনিক চন্দ্র পালের মৃত্যু আমাদের সামনে আবারও একটি আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় শুধু একজন শিক্ষার্থীর মুখ দেখা যায় না; দেখা যায় আমাদের পরিবার, শিক্ষা ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক মূল্যবোধ, মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতিকেও।

একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিয়ে কয়েক দিন শোক প্রকাশ করে তারপর ভুলে গেলে পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন পরীক্ষার নম্বরের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হবে; সাহায্য চাইলে তাকে দুর্বল বলা হবে না; অভিযোগ করলে নিরাপদ পরিবেশে তার কথা শোনা হবে; এবং মৃত্যুর পরও তার নামে মিথ্যা গল্প ছড়ানো হবে না।

একটি জীবন হারানোর পর কারণ খোঁজার চেয়ে, জীবিত অবস্থায় একজন মানুষের কষ্ট শুনতে শেখাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

কারণ আত্মহত্যার প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়—এটি আমাদের সমাজের সামনে রেখে যায় অসংখ্য প্রশ্ন।

লেখক: মো. হামিম ইসলাম সিফাত
শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়